আটকে পড়া পাকিস্তানি’ বা ‘বিহারী’ নয়, ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি, মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে নীলফামারীর সৈয়দপুরে মানববন্ধন করেছেন উর্দুভাষী ক্যাম্পবাসীরা।
আজ বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় সৈয়দপুর প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলন ও উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটি, সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলার উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন মাজিদ ইকবাল। এতে বক্তব্য দেন ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মধ্যে আ. লতিফ, নুর হাসান মোনাম, আলাউদ্দিন, আজগার আলী, মোছা. সানজিদা বেগম, গুলাম, মোছা. বুনদিয়া বেগম, ইসমাইল আলম, মো. শাহাজাদা, মো. চাঁন, মো. মনা ও সানিসহ অনেকে।
মানববন্ধনে সৈয়দপুরের বিভিন্ন ক্যাম্পের প্রায় দেড় হাজার নারী-পুরুষ অংশ নেন। এ সময় তারা ‘আটকে পড়া’ পরিচয়ের অবসান, ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি, মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
বক্তারা বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে দেশের নয়টি জেলার ১১৬টি ক্যাম্পে প্রায় তিন লাখ উর্দুভাষী মানুষ নানা সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন। অনেক ক্যাম্পে পরিবারগুলো মাত্র ৮ ফুট বাই ৮ ফুটের কুঠুরি ঘরে বসবাস করায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই জনগোষ্ঠীকে ‘বিহারী’, ‘আটকে পড়া পাকিস্তানি’, ‘আটকে পড়া বিহারী’ ও ‘অবাঙালি’সহ বিভিন্ন পরিচয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে তাদের নাগরিক পরিচয় ও অধিকার নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
বক্তাদের ভাষ্য, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করতে কয়েকজন তরুণের উদ্যোগে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে ২০০৩ ও ২০০৭ সালের রায়ে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ আসে। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সাল থেকে ক্যাম্পের বিপুলসংখ্যক বাসিন্দা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচিতির দাবি প্রতিষ্ঠা করেন বলে জানান বক্তারা।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, উচ্চ আদালতের রায় এবং বিপুলসংখ্যক ক্যাম্পবাসীর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকার পরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের ‘আটকে পড়া’ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। তাদের মতে, এ ধরনের পরিচয় নতুন প্রজন্মের সামাজিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মানববন্ধন থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের ১১৬টি ক্যাম্পে বসবাসরত জনগোষ্ঠীকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, দ্রুত মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু করা, পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পবাসীর বিদ্যুৎ সংযোগ নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং বিদ্যুৎ বিল পরিশোধে সরকারি উদ্যোগ নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত দেশের ১১৬টি ক্যাম্পে ক্যাম্পবাসীরা বর্তমানে যেখানে আছেন, সেখানে তাদের অবস্থান বজায় রাখা এবং কোনো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর দাবিও জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, ‘আটকে পড়া’ পরিচয়ের অবসান ঘটিয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ পরিচয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হলে দীর্ঘদিনের পরিচয় সংকটের অবসান ঘটবে। একই সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসনের মাধ্যমে ক্যাম্পবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
মানববন্ধনে বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলন ও উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির নেতাকর্মীসহ ক্যাম্পবাসীরা অংশ নেন।