বয়সের ভারে স্মৃতির অনেক পাতাই এখন তাঁর কাছে অস্পষ্ট। স্বামী কোথায়, বেঁচে আছেন কি না—মনে করতে পারেন না। নিজের বাড়ির ঠিকানাও বলতে পারেন না। সন্তান ছিল কি না, থাকলে তারা কোথায়—সেই উত্তরও হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে ভালো রানী দাসের আপন বলতে যেন পড়ে আছে কেবল একটি জীর্ণ চালা।
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক পাশে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয় নিয়ে আছেন নব্বই পেরোনো এই বৃদ্ধা। কয়েকটি পুরোনো কাপড়, পলিথিন আর দুর্বল কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একচালা ঘরটিই তাঁর সংসার। নেই নিরাপদ দেয়াল, নেই শক্ত ছাদ, নেই স্বজনের নিশ্চয়তা।
দিনের বেলায় রোদের তাপে ঘরটি হয়ে ওঠে দমবন্ধ করা গরম। আর বৃষ্টি নামলেই শুরু হয় আরেক দুর্ভোগ। চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে ভিজে যায় ঘরের ভেতর। বিছানা বা কাপড় শুকিয়ে রাখার মতো জায়গাও থাকে না। সম্প্রতি বৃষ্টির পানিতে ভিজে যায় তাঁর প্রয়োজনীয় সামগ্রী। বাধ্য হয়ে রাতের পর রাত ঘরের এক কোণে বসে কাটাতে হয়েছে তাঁকে।
বৃদ্ধার এই অসহায় অবস্থার খবর জানতে পারেন হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী। বিষয়টি শোনার পর আর দূরে থাকেননি তিনি। সরেজমিনে বৃদ্ধার ঘরে গিয়ে দেখতে পান, বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকুও নেই।
ভেজা ঘরের এক পাশে চুপচাপ বসেছিলেন ভালো রানী। কথার চেয়ে তাঁর চোখের ভাষাই যেন বেশি কিছু বলছিল। ইশারায় জানান, আকাশে বৃষ্টি এলেই তাঁর আতঙ্ক শুরু হয়। কখন পানি ঘরে ঢুকে সব ভিজিয়ে দেয়, আবার কখন ঝড়ের ধাক্কায় দুর্বল চালাটি উড়ে যায়—এই চিন্তায় থাকতে হয় তাঁকে।
এর সঙ্গে আছে মশার উৎপাত। রাত নামলে ঘুমানোর সুযোগও কমে যায়। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে জীবনের শেষ বয়সটাও যেন প্রতিদিন নতুন এক সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
বৃদ্ধার এমন পরিস্থিতি দেখে মানবিক উদ্যোগ নেন অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী। নিজের উদ্যোগে তাঁর জরাজীর্ণ ঘরটি মেরামতের ব্যবস্থা করেন। ক্ষতিগ্রস্ত চালাসহ প্রয়োজনীয় অংশ ঠিক করে দেওয়া হয়, যাতে অন্তত বৃষ্টি কিংবা ঝড়ের সময় ভালো রানী নিরাপদে থাকতে পারেন।
অধ্যক্ষের এই উদ্যোগে ভালো রানীর জীবনের সব কষ্ট হয়তো দূর হয়নি। হারিয়ে যাওয়া স্বজনের স্মৃতি ফিরেও আসেনি। কিন্তু মাথার ওপর একটি তুলনামূলক নিরাপদ ছাদ পেয়েছেন তিনি—জীবনের এই শেষ সময়ে এটুকুই হয়তো তাঁর জন্য অনেক বড় পাওয়া।
ভালো রানীর জীবনে এখন আর বড় কোনো চাওয়া নেই। সম্পদ, বাড়ি কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন—কোনোটিই তাঁর প্রত্যাশা নয়। বৃষ্টির রাতে যেন ঘরের ভেতর পানি না পড়ে, একটু শুকনো জায়গায় যেন ঘুমাতে পারেন—এই সামান্য নিরাপত্তাটুকুই তাঁর প্রয়োজন।
একজন মানুষের দুর্দশা দেখে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতার জন্য সবসময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি ছোট উদ্যোগ, একটু সহানুভূতি আর পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই কারও জীবনের কঠিন সময়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।
ভালো রানীর ভাঙা চালা হয়তো এখনো তাঁর জীবনের হারানো দিনগুলোর সাক্ষী। তবে সেই চালের নিচে অন্তত বৃষ্টির রাতে কিছুটা নিশ্চিন্তে থাকার সুযোগ করে দিয়ে অধ্যক্ষ লুৎফর চৌধুরী তাঁর জীবনের শেষ সময়টুকুতে স্বস্তির একটি দরজা খুলে দিয়েছেন।