দুই হাতের কব্জি নেই, একটি চোখও হারিয়েছেন। অথচ জীবনযুদ্ধে থেমে যাননি নীলফামারীর ডোমারের শিক্ষক আব্দুল হাকিম। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছেন তিনি। তার কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোর পথে এগিয়ে গেছে শত শত শিক্ষার্থী।
ডোমার উপজেলার ডোমার সদর ইউনিয়নের বড় রাউতা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল হাকিম বর্তমানে দক্ষিণ বড় রাউতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র সাত বছর বয়সে ঘটে তার জীবনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা। খেলতে গিয়ে মাঠে পড়ে থাকা একটি বোমা হাতে তুলে নিয়েছিলেন শিশু আব্দুল হাকিম। মুহূর্তেই সেটি বিস্ফোরিত হলে গুরুতর আহত হন তিনি। দুর্ঘটনায় দুই হাতের কব্জি হারানোর পাশাপাশি নষ্ট হয়ে যায় একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো তার ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হয়ে পড়তেন। কিন্তু আব্দুল হাকিমের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে চালিয়ে যান পড়াশোনা। এইচএসসি পাস করার পর বাড়ির কাছের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর কেটে গেছে দুই যুগেরও বেশি সময়। এখনও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে যাচ্ছেন তিনি।
শুধু শিক্ষকতাই নয়, নিজের দৈনন্দিন কাজও স্বাভাবিকভাবেই করেন আব্দুল হাকিম। সাইকেল চালানো, লেখালেখি, কৃষিকাজ কিংবা ঘরের বিভিন্ন কাজ—সবকিছুতেই রয়েছে তার স্বাভাবিক অংশগ্রহণ। অবসর সময়ে ছেলে রাকিব হোসাইনের ফার্মেসির কাজেও সহযোগিতা করেন। সন্তানদের লেখাপড়ার পেছনেও তিনি রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়ে আব্দুল হাকিম জানান, ছোটবেলায় বোমা বিস্ফোরণের পর তার অবস্থা দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন, ভবিষ্যতে হয়তো তাকে ভিক্ষা করে জীবন কাটাতে হবে। কিন্তু সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে পড়াশোনা শেষ করেন এবং শিক্ষকতার পেশায় যুক্ত হন।
তিনি বলেন, নিজের চেষ্টা এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাসই তাকে এতদূর আসতে সহায়তা করেছে। হতাশাগ্রস্ত মানুষদেরও ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে মনপ্রাণ দিয়ে চেষ্টা করলে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
আব্দুল হাকিমের ছেলে রাকিব হোসাইন বলেন, তার বাবা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হলেও কাজের ক্ষেত্রে পরিবারের সুস্থ সদস্যদের অনেককেই ছাড়িয়ে যান। শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজ, পারিবারিক কাজ এবং তার ব্যবসায়ও বাবাকে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। বাবার জীবনসংগ্রাম ও সাফল্য তাদের পরিবারের জন্য গর্বের বিষয় বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ মামুনের ভাষ্য, ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন আব্দুল হাকিম। নিজের জীবনে সফল হওয়ার পাশাপাশি সন্তানদেরও সুশিক্ষিত করেছেন। তার সংগ্রামী জীবন এলাকার অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে, আব্দুল হাকিমের দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা ও জীবনসংগ্রামকে সম্মান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে ডোমার উপজেলা প্রশাসন।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আফজালুল হক বলেন, দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও আব্দুল হাকিম যেভাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তা দেখে তিনি প্রথমে বিস্মিত হয়েছিলেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও আন্তরিক। তার মতো সংগ্রামী মানুষকে সম্মানিত করলে সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষরা অনুপ্রেরণা পাবেন বলে মনে করেন তিনি।
ডোমার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শায়লা সাঈদ তন্বী বলেন, আব্দুল হাকিমের কর্মজীবন ও জীবনসংগ্রাম সবার জন্য অনুপ্রেরণার। তার প্রতি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি তার সুস্থতা ও দীর্ঘ কর্মময় জীবনের জন্য দোয়া করেন। তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে - সারাবাংলাথেকে।