নীলফামারীর সৈয়দপুরে বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মেয়াদপূর্তির পর গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা ও নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। বছরের পর বছর কিস্তি দিয়ে বীমা করার পর নির্ধারিত সময় শেষে অর্থ ফেরত না পেয়ে অনেক গ্রাহক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
গ্রাহকদের ভাষ্য, বীমা পলিসি গ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধি ও এজেন্টরা ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা, আকর্ষণীয় সুবিধা এবং মেয়াদ শেষে নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ পাওয়ার নানা প্রতিশ্রুতি দেন। এসব কথায় আস্থা রেখে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের বহু মানুষ নিয়মিত কিস্তিতে বীমা করেন। তবে পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অর্থ দাবি করতে গিয়ে তাদের একাংশকে ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, টাকা চাইতে গেলে কখনো প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতির কথা বলা হচ্ছে, আবার কখনো গ্রাহকদের প্রধান বা আঞ্চলিক কার্যালয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে সমাধান না পেয়ে অনেককে দীর্ঘদিন ধরে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজনের দাবি, পলিসির নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও মাসের পর মাস, এমনকি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মূল জমা ও প্রাপ্য অর্থ হাতে আসছে না। আর্থিক প্রয়োজনের কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পলিসি বন্ধ বা জমা অর্থ ফেরত চাইলে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। পাওনা অর্থের বিষয়ে জানতে গিয়ে কোনো কোনো গ্রাহক স্থানীয় কর্মকর্তা বা প্রতিনিধির কাছ থেকে অসৌজন্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন।
সৈয়দপুরে বীমা খাতে এমন অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সৈয়দপুর কার্যালয় ঘিরে প্রায় ৩ হাজার গ্রাহকের প্রায় ২ কোটি টাকা আটকে থাকার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অনেক গ্রাহকের পলিসির মেয়াদ পাঁচ থেকে আট বছর আগে শেষ হলেও তারা পাওনা অর্থ বুঝে পাননি। পাশাপাশি স্থানীয় শাখা গুটিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
ভুক্তভোগীদের অনেকেই জানান, দীর্ঘদিন নিয়মিত কিস্তি দেওয়ার পেছনে ছিল নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। কেউ সন্তানের লেখাপড়া, কেউ বিয়ে, ব্যবসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজন মেটাতে মেয়াদ শেষে পাওয়া অর্থ ব্যবহারের কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে অর্থ হাতে না আসায় তাদের সেই পরিকল্পনা ব্যাহত হয়েছে এবং অনেকে আর্থিক চাপে পড়েছেন।
গ্রাহকদের আরও অভিযোগ, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। স্থানীয় এজেন্ট কিংবা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেও সমাধান না পাওয়ায় গ্রাহকদের বাধ্য হয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কার্যালয়ের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম বা গ্রাহকসেবার ঘাটতির কারণে পুরো বীমা খাতকে একই দৃষ্টিতে দেখা ঠিক নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা এজেন্টের ভুল তথ্য, অনিয়ম কিংবা দায়িত্বে অবহেলার কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি তৈরি হতে পারে।
বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করছে। পলিসি-সংক্রান্ত তথ্য জানার সুবিধার্থে সংস্থাটির অনলাইন বীমাগ্রাহক পোর্টালও রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহকেরা পলিসির বিভিন্ন তথ্য, প্রিমিয়াম জমার হিসাবসহ প্রয়োজনীয় বিষয় যাচাই করতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পলিসির নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে মেয়াদপূর্তির অর্থ পাওয়ার অধিকার বীমাগ্রহীতার রয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিলের পর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দাবি নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে।
সৈয়দপুরের সচেতন নাগরিকদের দাবি, শহরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের পরিস্থিতি, স্থানীয় কার্যালয়ের কার্যক্রম এবং এজেন্টদের ভূমিকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে অর্থ না পাওয়া গ্রাহকদের অভিযোগ যাচাই করে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আইডিআরএ, সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানি ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। এতে বীমাগ্রাহকদের হয়রানি কমার পাশাপাশি খাতটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও সুদৃঢ় হতে পারে।