নীলফামারীর সৈয়দপুরে পবিত্র মহররম এলেই যেন শহরটি নতুন এক আবহে জেগে ওঠে। ধর্মীয় শোকানুষ্ঠানের পাশাপাশি শতবর্ষের ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক ব্যতিক্রমী রূপ ফুটে ওঠে পুরো শহরজুড়ে। দেশের বিভিন্ন স্থানে আশুরা পালিত হলেও আয়োজনের বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের কারণে সৈয়দপুরের নাম আলাদাভাবে উচ্চারিত হয়।
চাঁদ দেখা দেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতির ব্যস্ততা। শহরের অর্ধশতাধিক ইমামবাড়া পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হয়। নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন তোরণ, ঝলমলে আলোকসজ্জায় আলাদা সৌন্দর্য পায় প্রতিটি প্রাঙ্গণ। একই সময়ে দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি হতে থাকে নানা নকশার তাজিয়া, যা কারবালার স্মৃতিকে প্রতীকীভাবে ধারণ করে।
দীর্ঘদিন ধরে তাজিয়া নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কারিগর জাবেদ ইসলাম জানান, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতিবছর নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে এসব তাজিয়া তৈরি করা হয়। প্রতিটি নির্মাণে ঐতিহ্যের পাশাপাশি থাকে ধর্মীয় অনুভূতির গভীর ছাপ।
মহররমের অন্যতম আয়োজক শাহিদ চিশতী বলেন, মাসের শুরুতেই কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালার মাটি শহরের প্রতিটি ইমামবাড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়। সেই মাটি নির্ধারিত নিয়মে তাজিয়ার নিচে সংরক্ষণ করা হয়। আশুরার দিন শোকমিছিলের মাধ্যমে আবার সেই মাটি কেন্দ্রীয় কারবালায় ফিরিয়ে এনে আনুষ্ঠানিকতার সমাপ্তি ঘটে। এ সময় মানতের অংশ হিসেবে অনেকেই প্রতীকী দুলদুলের সাজ ধারণ করেন।
মহররমের রাতগুলোতে সৈয়দপুরের পরিবেশ হয়ে ওঠে একেবারেই ভিন্ন। ঢোলের ছন্দ, কাসিদা পাঠ, 'ইয়া হোসাইন' ধ্বনি এবং শোকগাথা শহরের অলিগলিতে বিশেষ আবহ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন এলাকায় অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা, তলোয়ার প্রদর্শনী, আগুনের কসরত, নিয়াজ, ফাতেহা ও নিশান উত্তোলনের মতো নানা কর্মসূচি।
নবম মহররমের রাতে ইমামবাড়াগুলোতে তাজিয়া স্থাপনের পর শুরু হয় মূল আনুষ্ঠানিকতা। আশুরার দিন পর্যন্ত পাইকরা দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন ইমামবাড়া পরিদর্শন করে কাসিদা পাঠ করেন। অনেক এলাকায় বসে ধর্মীয় আসর ও ছোট ছোট মেলা, যা উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি শোকের আবহও বহন করে।
সৈয়দপুরের এই আয়োজনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ধর্মীয় সম্প্রীতি। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ইমামবাড়ায় গিয়ে মানত করেন, দোয়া ও ফাতেহায় অংশ নেন। স্থানীয়দের মতে, ইমাম হোসাইন (রা.)-এর ত্যাগ ও ন্যায়ের আদর্শ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে অনুকরণীয়।
কেন্দ্রীয় প্রতীকী কারবালার আয়োজক কমিটির সদস্য ফিরোজ জানান, মহররমের প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি ইমামবাড়ায় প্রস্তুতি শুরু হয়। সপ্তম দিনে প্রতীকী কারবালার মাটি পৌঁছে দেওয়া হয় এবং আশুরার দিন তা আবার শোকমিছিলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হয়। এ সময় হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কারবালা এলাকা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রইচ উদ্দিন বলেন, সৈয়দপুরের মহররম শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি এ অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অংশ। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য মানুষ এই অনন্য আয়োজন দেখতে আসেন।
আয়োজনকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনও থাকে তৎপর। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের পাশাপাশি সব ইমামবাড়ায় মোতায়েন করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম রেজা জানান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আশুরার সব কর্মসূচি সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
শোকের স্মৃতি, আত্মত্যাগের শিক্ষা, লোকজ ঐতিহ্য এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য সমন্বয়ে প্রতি বছর মহররমে নতুন পরিচয়ে ধরা দেয় সৈয়দপুর—যা সময়ের পরিক্রমায় দেশের অন্যতম ব্যতিক্রমী ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।