নিজস্ব প্রতিবেদক, সৈয়দপুর
নীলফামারীর সৈয়দপুরে নীরবে বিকশিত হয়েছে একটি সম্ভাবনাময় কুটিরশিল্প। আগরবাতি উৎপাদনকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই শিল্প আজ শুধু স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত নয়, বরং হাজারো নারীর কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতার অন্যতম মাধ্যম। দীর্ঘদিন ধরে শহর ও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট-বড় উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে লাখ লাখ আগরবাতি, যা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় দুই যুগ ধরে সৈয়দপুরে আগরবাতি উৎপাদনের প্রচলন রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত কারখানা ও অসংখ্য পারিবারিক উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে শহরের ২২টি বিহারি ক্যাম্পসহ বিভিন্ন মহল্লার প্রায় ১০ হাজার নারী সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ঘরের কাজের পাশাপাশি আগরবাতি তৈরি করে তারা পরিবারের আয় বাড়াচ্ছেন এবং নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি করছেন।
আগরবাতি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় কয়লার গুঁড়া, কাঠের ভুসি ও বিজলার ছালের গুঁড়া। নির্দিষ্ট অনুপাতে এসব উপকরণ মিশিয়ে মেশিনে পেস্ট তৈরি করা হয়। পরে সেই মিশ্রণ কাঠির ওপর বসিয়ে বিভিন্ন ধরনের আগরবাতি প্রস্তুত করা হয়। রোদে শুকানোর পর এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। পরে প্রতিষ্ঠানগুলো সুগন্ধি সংযোজন করে নিজস্ব ব্র্যান্ডে বাজারজাত করে।
একসময় বাড়ির উঠান বা বারান্দায় সম্পূর্ণ হাতে আগরবাতি তৈরি হতো। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় এখন ছোট ছোট মেশিনের মাধ্যমে উৎপাদন হচ্ছে। এতে শ্রম কমেছে, উৎপাদনের গতি বেড়েছে এবং পণ্যের মানও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে।
সরেজমিনে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অবসর সময়ে অনেক নারী বাড়িতেই আগরবাতি তৈরির কাজে ব্যস্ত। কাঁচামাল উদ্যোক্তারা বাড়িতে পৌঁছে দেন এবং প্রস্তুত পণ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যান। একজন নারী প্রতিদিন কয়েক হাজার আগরবাতি তৈরি করে অতিরিক্ত আয় করছেন, যা পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাঁশবাড়ী এলাকার উদ্যোক্তা মাসুম বলেন, আগে সম্পূর্ণ হাতের কাজের ওপর নির্ভর করতে হতো। বর্তমানে মেশিন ব্যবহারের ফলে শ্রম কমেছে এবং উৎপাদনের মান ও পরিমাণ—দুটিই বেড়েছে। ফলে বাজারেও চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় নারী ফারজান, ফরিদা পারভীন, বিলকিস, আমেনা বেগম ও শমামীর মতো অসংখ্য নারী জানান, গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি আগরবাতি তৈরি করে তারা নিয়মিত আয় করছেন। এই আয় পরিবারের আর্থিক সংকট কমানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করছে। অনেক নারী নিজেদের উদ্যোগেও ছোট পরিসরে উৎপাদন শুরু করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হলে সৈয়দপুরের আগরবাতি শিল্প আরও বিকশিত হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির পাশাপাশি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়বে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) নীলফামারী জেলা কার্যালয় জানিয়েছে, আগরবাতি শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও ঋণ সুবিধা প্রদানে তারা কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সৈয়দপুরের আগরবাতি শিল্প দেশের অন্যতম সফল কুটিরশিল্পে পরিণত হতে পারে।